মুঘল সম্রাট বাবর এর জীবনী

মুঘল সম্রাট বাবর (1483 – 1530)

জন্ম :- 1483 খ্রিস্টাব্দের 14 ফেব্রুয়ারি মধ্যএশিয়ার (রুশ-তুরস্কের মধ্যবর্তী স্থানে) ফরগনা প্রদেশে মাতা কুতলুগ নিগার খানুমের কোল আলোকিত করে ধরিত্রীর আঁচল তলায় বাবর ভুমিস্ট হন।পিতা ওমর শেখ মির্জার দিক থেকে তিনি ছিলেন তৈমুর লঙের বংশধর এবং মাতার দিক থেকে তিনি ছিলেন চেঙ্গিস খাঁর বংশধর।বাবরের পুরোনাম জহিরুদ্দিন মহম্মদ বাবর।মঙ্গোলীয় ভাষায় বাবর কথার অর্থ ‘বাঘ’।তিনি মাত্র 12 বছর বয়সে (1495 খ্রিস্টাব্দে) সিংহাসনে বসেন ও ফরগনার (উজবেকিস্তান) মালিক হন।সিংহাসনে বসেই 1497 খ্রিস্টাব্দে সমরখন্দ দখলের মধ্য দিয়েই বাবরের সাম্রাজ্যেবাদী জীবনের ব্যর্থতা ও সাফল্যেতার শুভ সূচনা হয়।

1497 খ্রিস্টাব্দে তিনি নিজের পৈতৃক ভূমি ফরগনা হারালেও ঠিক পরের বছর 1498 খ্রিস্টাব্দে তা পুনরুদ্ধার করেন।কিন্তু 1501 খ্রিস্টাব্দে ফরগনাতে বাবরের প্রধান প্রতিবন্ধক সাহাবানি খান (উজবেক শাসক) বাবরকে পরাস্ত করে তার বোন খান্দাজা বেগমকে বিয়ে করেন।বাবর সিংহাসন হারিয়ে আশ্রয়ের জন্য মামা মাহমুদ খানের কাছে তাসখন্দে যান।তার এই পরাজয়ের গ্লানি দূর করে পুনরায় 1503 খ্রিস্টাব্দে ফরগনা দখলের চেষ্টা করলে ‘অর্চিয়ানের’ যুদ্ধে বাবর আবারও ব্যর্থতায় পর্যভূষিত হন।তিনি বারংবার ব্যর্থ হলেও নিজের প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখে 1504 খ্রিস্টাব্দে আবারও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং উলূঘ বেগের শিশুপুত্র আব্দুর রজ্জাকের কাছ থেকে কাবুল অধিকার করে “আফগানিস্তানের বাদশাহ”-উপাধি নেন।এখানেই তিনি থেমে থাকেনি এরপর 1507 খ্রিস্টাব্দে গজনী দখল করে নিজেকে “বাদশাহ” উপাধিতে ভূষিত করেন।এর ঠিক এক বছর পর অর্থাৎ 1508 খ্রিস্টাব্দে বাবরের তৃতীয় স্ত্রী মোহম বেগমের গর্ভে নাসিরউদ্দিন হুমায়ুন জন্মগ্রহণ করেন।বাবরে বৈধ স্ত্রীর সংখ্যা ছিল সাত জন। বাবরের মোট পুত্রের সংখ্যা ছিল চার জন।এই চারটি পুত্র হলো হুমায়ুন-আশাকরি-কামরান এবং হিন্দাল।গুলবদন বেগম ছিল বাবরের একমাত্র কন্যা সন্তান,যিনি পরবর্তীকালে হুমায়ুনের জীবন কাহিনী নিয়ে ফার্সী ভাষায় লেখেন “হুমায়ুননামা।

এরপর বাবর 1511 খ্রিস্টাব্দে পারস্যের সম্রাট ইসমাইল শাহের সঙ্গে মিত্রতায় সমরখন্দ ও মধ্যএশিয়া জয় করেন।1512 খ্রিস্টাব্দে উজবেকী সর্দার উবাইদ উল্লাহ খান “গাজদাওয়ানের”-যুদ্ধে ইসমাইল শাহ ও বাবরের যৌথ বাহিনীকে পরাস্ত করেন।ব্যর্থতায় মোড়া প্রথম জীবন শুরু হলেও তিনি হাল ছাড়েননি উজবেকদের কাছ থেকে তুলুঘ্মা ও আবা যুদ্ধ পদ্ধতি শিখে নিজেকে পরিণত করে 1518 খ্রিস্টাব্দে পুনরায় রাজ্যজয়ে মনোনিবেশ করেন। শুরু হয় তাঁর জীবনের যুগান্তকারী দ্বিতীয় অধ্যায়।

1519 খ্রিস্টাব্দে জহিরুদ্দিন মহম্মদ বাবর খাইবারপাশ দিয়ে প্রথম ভারত অভিযান করেন।এই সময় ইউসুফজাই উপজাতিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলে বাবর তাদের দমনের জন্য ভারত ও আফগানিস্তান সীমান্তে উপস্থিত হয়ে ভেরা নামক স্থান জয় করেন,দখল করেন বাজাউর।বাবর ভেরার যুদ্ধে প্রথম কামানের ব্যবহার করেন।1519 খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে দ্বিতীয় বার ভারত আক্রমণ করে খিজিরখালি আফগানদের হারিয়ে পেশোয়া দখল করেন।কিন্তু বাদখশানে বিদ্রোহ শুরু হলে বাবর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।এখানেই থেমে থাকেননি তিনি 1520 খ্রিস্টাব্দে বাবর তৃতীয়বার ভারত আক্রমণ করেন।বাজাউর,ভেড়া এবং শিয়ালকোট খুব সহজে দখল করেন কিন্তু কান্দাহারে বিদ্রোহ শুরু হলে তিনি দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হন।1524 খ্রিস্টাব্দে বাবর আবারও ভারত আক্রমণ করেন।এই সময় লাহোরের শাসনকর্তা দৌলত খাঁ লোদী ও তার পুত্র দিলওয়ার খান এবং গুজরাটের শাসনকর্তা আলম খাঁ বাবরের সাহায্য পাঠান।ঐ বছরই বাবর লাহোর ও দীপালপুর অধিকার করেন।কিন্তু অভিযানের মাঝপথে দৌলত খাঁর সাথে বাবরের মতবিরোধ দেখা দিলে বাবর কাবুলে ফিরে যান।দৌলত খাঁ লোদী লাহোর পুনরুদ্ধার করেন।ভারত আক্রমণের নেশায় দ্বিকবিজয়ী বীর বাবরকে ব্যতীব্রস্ত করে তুলেছিল তাই তিনি 1525 খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে পঞ্চম তথা শেষ ভারত আক্রমণ করেন।দৌলত খাঁ লোদী শেষ পর্যন্ত বাবরের সাথে থাকলেও গুজরাটের শাসনকর্তা আলম খাঁ গুজরাটে গিয়ে আশ্রয় নেয়।এই আলম খাঁ লোদীই ছিলেন দিল্লীর সিংহাসনের প্রধান দাবিদার।1526 খ্রিস্টাব্দের 26 শে ফেব্রুয়ারি বাবরের জেষ্ঠ্য পুত্র হুমায়ুন হামিদ খানকে পরাস্ত করে হিসার-ফিরোজা শহর লুঠ করেন।বাবর হুমায়ুনের এই সাফল্যে খুশি হয়ে হিসার-ফিরোজার শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেন।

1526 খ্রিস্টাব্দের 21 শে এপ্রিল ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের পানিপথ গ্রামে প্রথম পানিপথের যুদ্ধে বাবর ইব্রাহিম লোদীকে পরাস্ত করে ভারতের মাটিতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।এই যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীর পক্ষে ছিল 1 লক্ষ সেনা,1 লক্ষ হস্তী বাহিনী।ওপর পক্ষে বাবরের 12 হাজার সৈনিক এবং 20 থেকে 24 টি ফিল্ড আর্টিলারি।এই যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীর পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে লোদী বংশের অবসান ঘটে।তবে এই যুদ্ধ ছিল গোলা, বারুদ ও কামানের যুদ্ধ।1526 খ্রিস্টাব্দের 27 শে এপ্রিল বাবর দিল্লীর জামি মসজিদে নিজের নামে খুদবা পাঠ করেন।

এরপর বাবর পুত্র হুমায়ুন একের পর এক আগ্রা-জৈনপুর-গান্ধীপুর- কলপি এবং গোয়ালিয়র দখল করেন।হুমায়ুন গোয়ালিয়োরের রাজা বিক্রমজিতের কাছ থেকে বহু মূল্যবান হীরে কেড়ে নিয়ে পিতা বাবরকে উপহার দেন।এর ওজন ছিল 320 রতি এবং সমগ্র বিশ্বের আড়াই দিনের খাদ্যের মূল্যের সমান ছিল এর মূল্য।1526 খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ইব্রাহিম লোদীর মা বাবরের খাদ্যে বিষ মেশালে বাবর অল্পের জন্য রক্ষা পান।
ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের স্থায়ীত্বকরণের জন্য যে যুদ্ধটির জয় অপরিহার্য ছিল তাহল খানুয়ারের যুদ্ধ।মেবারের রানা সঙ্গ প্রথম পানিপথের যুদ্ধে সাহায্য করলেও 1527 খ্রিস্টাব্দের 17 ই মার্চ খানুয়ারের যুদ্ধে বাবর রানা সঙ্গকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করে মুঘল শাসনকে সুদৃঢ় করেন।উল্লেখ্য এই যুদ্ধে জয়ের পরই বাবর “গাজী”-উপাধি নেন।চান্দেরীর মেদিনী রাই ছিলেন রানা সঙ্গের সহযোগী যদিও তিনি খানুয়ারের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যান।তবে পরবর্তীকালে বাবর 1528 খ্রিস্টাব্দের 21 শে জানুয়ারি “চান্দেরীর”-যুদ্ধে মেদিনী রাইকে হারিয়ে চান্দেরী দুর্গ দখল করে নেন।বাবর তাঁর দুই পুত্র হুমায়ুন ও কামরানকে মেদিনী রাই এর দুই মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে বাবর ভারতে রাজপুত বিবাহ নীতির বীজ বপন করেন।

এরপর 1528 খ্রিস্টাব্দের 2 রা ফেব্রুয়ারি বাবরের সেনাপতি অযোধ্যা ও লখনৌ জয় করেন।সুলতান ইব্রাহিম লোদীর ভাই মামুদ লোদী বাংলার সুলতান নসরৎ শাহের সহযোগিতায় মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান।1529 খ্রিস্টাব্দের 6 ই মে রাজস্থানের ঘাগরা নদীর তীরে ঘর্ঘরার বা ঘাঘরার যুদ্ধে আফগান বাহিনীর পরাস্ত করেন।আফগান বলতে বোঝায় বাংলা-বিহার ও জৈনপুরে শাসনকর্তাকে।এই সময় বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন নসরৎ শাহ,জৈনপুরের শাসনকর্তা মামুদ লোদী (ইব্রাহিম লোদীর ছোটো ভাই)।ইনিই ছিলেন বাবরের প্রধান প্রতিপক্ষ এবং বিহারে শাসনকর্তা শের খাঁ।এই যুদ্ধই ছিল বাবরের জীবনে শেষ যুদ্ধ।উল্লেখ্য বাবর ভারতের চারটি যুদ্ধ করেন এবং চারটি যুদ্ধই জয়লাভ করেন।

সাহিত্য প্রতিভার নিদর্শন:- সমস্ত মুঘল সম্রাটদের মধ্যে বাবরই ছিলেন একজন লেখক।বাবর তুর্কী ভাষায় “তুজুক-ই-বাবরী” বা “বাবরনামা” নামে এক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ লেখেন।তৈমুরের বংশধরদের মধ্যে বাবরই ছিলেন একজন অত্যন্ত শিক্ষিত অভিজাত মানুষ।তাঁর এই শিক্ষিত ও মার্জিত মননের প্রতিফল “তুজুক-ই-বাবরী”তে আমরা দেখতে পাই।প্রকৃতি-সমাজ-রাজনীতি ও অর্থনীতি সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর চিন্তা ভাবনা ধ্যান ধারণাও এই “তুজুক-ই-বাবরী”তে প্রতিফলিত হয়েছে।জীবনের নানা বিষয় ও দিক সমন্ধে তিনি আগ্রহী ছিলেন।ফলে এই বইতে শুধুমাত্র আমরা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনাবলীর বাইরেও তিনি যেসব অঞ্চলে বাস করেছেন বা নানা সময়ে ভ্রমণ করেছেন সেইসব অঞ্চলের ইতিহাস ও ভূগোল সম্পর্কেও বহু কিছু জানতে পারি।এছাড়াও তার পরিচিত মানুষদের সম্পর্কেও খুব সুন্দর ও জীবন্ত বিবরণ এই “বাবরনামা”র এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য।ফলে এই সময়ের ইতিহাসকে জানার পক্ষে তাঁর লেখা এই গ্রন্থটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উপাদান হিসেবেই সাধারণভাবে গণ্য করা হয়ে থাকে। এছাড়াও তিনি ফার্সী ভাষায় “মুবাইয়ান”-নামে কাব্যগ্রন্থ লেখেন।এছাড়াও বাবর ছিলেন একজন চিত্র শিল্পী এবং তাঁর হস্তাক্ষর ছিল খুবই সুন্দর।বাবরের ব্যক্তিগত চরিত্রকে নিয়ে তাঁর খুড়তুতো ভাই মির্জা হায়দার লেখেন “তারিখ-ই-রশিদি”-নামে একটি গ্রন্থ।

সাহিত্যের পাশাপাশি বাবর স্থাপত্য শিল্পেরও যথেষ্ট কদর করতেন।পানিপথের প্রথম যুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে তিনি পানিপথে “কাবুলিবাগ মসজিদ”-নির্মাণ করেন।এছাড়াও নির্মাণ করেন সম্বলপুরে(রোহিলাখণ্ডে) জাম্মা বা জমি মসজিদ এবং আগ্রাতে নির্মাণ করেন লোদী দূর্গ।বাবরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো “খাত-ই-বাবরী”নামে একটি তুর্কী হরফের প্রচলন।
শেষ জীবন :- 1530 খ্রিস্টাব্দের 26 শে ডিসেম্বর বাবর 48 বছর বয়সে আগ্রায় মারা যান।এই দ্বিকবিজয়ী বীরকে প্রথমে সমাহিত করা হয় আগ্রার আরামবাগে।পরে তাঁর এই সমাধি মন্দির স্থান্তরিত করা হয় আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে।কাবুলে তাঁর সমাধি মন্দিরের নাম ছিল “গার্ডেন্স অফ বাবর”বা “বাঘ-ই-বাবর”।

জীবনের প্রথম অধ্যায় ব্যর্থতার চাদরে মোড়া থাকলেও জীবনের দ্বিতীয় ও শেষ অধ্যায় ছিল সাফল্যতায় মোড়া।বাবরের সাম্রাজ্যবাদী জীবনের বিভিন্ন ঘটনা তাঁর সাহিত্য প্রতিভা আজও ইতিহাস প্রেমীদের মন হরণ করে।

আরো পড়ুন 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*